মধুপিডিয়া

মধু কীভাবে তৈরি হয়?

মৌমাছি মধু তৈরির জন্য ফুলের রস, বা মকরন্দ বা পুষ্পাসব (nectar) ব্যবহার করে। ফুলের মধু ও রেণু সংগ্রহ করার জন্য মৌমাছি তাদের মৌচাক থেকে বিভিন্ন দূরত্বে উড়ে বেড়ায়। কাছাকাছি পর্যাপ্ত ফুল না পাওয়া গেলে ৭, ৯ এমনকি এরচেয়েও বেশি কিলোমিটার দূরত্বে মৌমাছি যেতে পারে। তবে মৌমাছির ওড়ার জন্য সাবলীল দূরত্ব হলো দেড় থেকে দুই কিলোমিটার।

যেসব জায়গায় খাদ্যের উৎস সংখ্যায় অধিক এবং বেশি দৃশ্যমান, সেখানে মৌমাছি অধিক ব্যাসার্ধে ওড়ে। আর যেখানে গাছ, ঝোপঝাড়, রাস্তা, নদী ইত্যাদির মতো থাকার জায়গা কম, সেখানে কম ব্যাসার্ধে ওড়ে। গবেষণা থেকে প্রমাণিত যে মৌমাছি ৩ কিলোমিটার দূরত্বে স্থাপন করলে তারা সংগৃহিত খাদ্যের মাত্র এক-তৃতীয়াংশ সঞ্চয় করে। নদী বা লেকের মতো বিশাল জলাধার এলাকায় অথবা প্রচুর বাতাস বওয়া এলাকায় মৌমাছি সহজে উড়তে পারে না। ফুলের রস আর রেণু বহন করা অবস্থায় অনেক সময় তারা দলে দলে পানিতে পড়ে ডুবে যায়।

কর্মী মৌমাছি যখন ফুলের কাছে যায়, তখন সে তার হুল (টিউবের মতো শোষণাঙ্গ) বের করে আনে। সাধারণ অবস্থায় এটি তার “থুতনি”র নিচে লুকানো থাকে। ফুলের মধু যেখানে থাকে, সেখানে সে হুল প্রবেশ করায়। ফুলের রসের অবস্থান নির্ণয় করার পর সে তার সামর্থ্য পরিমাণ রস শোষণ করতে থাকে যা তার “মধু পাকস্থলি”তে জমা হয়। মৌমাছির আসলে দুটি পাকস্থলি থাকে। একটিতে ফুলের রস জমা করা হয়, আরেকটি স্বাভাবিক পাকস্থলির কাজ করে। মধু পাকস্থলির ধারণক্ষমতা প্রায় ৭০ মিলিগ্রাম। পূর্ণ অবস্থায় এর অজন হয় প্রায় মৌমাছিটার সমান। এই পাকস্থলি পূর্ণ করতে মৌমাছিকে ১০০ থেকে ১৫০০ ফুল পর্যন্ত ভ্রমণ করা লাগতে পারে। তবে মৌমাছিকে আকর্ষণ করার মতো রস সব ফুল থেকে ক্ষরিত হয় না।

মৌচাকে ফেরার পথেই এনজাইমের সহায়তায় মধু প্রক্রিয়াজাতকরণ শুরু হয়ে যায়। সংগৃহিত রসে আবহাওয়ার উপর ভিত্তি করে ৬০-৮০% আর্দ্র উপাদান থাকে। রস থেকে মধুতে পরিণত হওয়ার প্রক্রিয়ায় প্রধান ধাপ পানির বাষ্পীভবন। আর্দ্রতা না কমালে ফুলের রসে গাঁজন ঘটে তা নষ্ট হয়ে যায়।

মৌমাছি যখন “ঘরে ফিরে” আসে, তার সারাদিনের সংগৃহীত রসের বোঝা ৪-৫টি কর্মীর কাছে দেয়। সেগুলো আবার ৮-১০টি অল্পবয়স্ক মৌমাছির কাছে যায়। এভাবে একটি মৌমাছির আনা রস ৫০টি অল্পবয়স্ক মৌমাছির কাছে বণ্টিত হয়। মৌচাকে থাকা এসব মৌমাছি আধা ঘন্টা ধরে সেই রস “চিবায়”। এসময় ফুলের রস বিভিন্ন এনজাইম ও পুষ্টিতে ভরপুর থাকে। সেখানেও কিছুটা পানি বাষ্পীভূত হয়। তরল যখন ৩৫-৪০% এ নেমে আসে, তখন তারা প্রক্রিয়াকৃত ফুলের রস বিন্দুটি মোমের কোষের তলায় জমা করতে থাকে। কর্মী মৌমাছিরা তাদের ডানা ঝাপটানোর মাধ্যমে চাকে বায়ু চলাচল জারি রাখে, যাতে বাষ্পীকরণ চলতে থাকে। মৌচাক থেকে সবসময় গুনগুন শব্দ আসে কারণ মৌমাছি রাতেও কাজ করা থামায় না।

পুষ্পাসবের জলীয় অংশ ১৫-২১% এ পৌঁছে তখন এনজাইমের ক্রিয়ায় সুকরোজের পরিমাণ ৫% এ পৌঁছে। সাধারণত ফুলের রসের এই অবস্থাটিকেই মধু বলে। এ প্রক্রিয়া শেষ হতে এক থেকে তিন দিন সময় লাগে। ফুলের রস থেকে মধু বানানোর সময় নির্ভর করে ফুলের রসে পানির পরিমাণ, মৌচাকে তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার পরিমাণ, মৌচাকে কর্মী মৌমাছির সংখ্যা, এবং ফুলের রসের সরবরাহের ওপর। আর্দ্রতার পরিমাণ যখন সর্বনিম্ন মাত্রা ১৮% এ নেমে আসে, তখন এর উপর মোমের একটি আস্তরণ করে দেওয়া হয়। মোমের আস্তরণের ঢাকনা না দেওয়া অবধি সেই মধুটা পরিপক্ক হিসেবে ধরা হবে না। পরিপক্ক মধু নষ্ট হয় না।

গড়পড়তা, একটি কর্মী মৌমাছি তার সারা জীবনে এক চা চামচের ১২ ভাগের ১ ভাগ মধু উৎপাদন করে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *