মধুপিডিয়া

মধু কী দিয়ে তৈরি?(বিস্তারিত তালিকা)

প্রাকৃতিক মধুর গঠন অত্যন্ত জটিল এবং বৈচিত্র্যময়। এর উপাদানগুলো সরাসরি পুষ্টি, মাটি, আবহাওয়া, মৌমাছির জাত ও শক্তি, ফুলের রস আহরণের অবস্থা এবং মৌচাষীর মৌমাছি পালন পদ্ধতির ওপর নির্ভরশীল।

মধুতে সব উপাদানের ব্যাপারে তালিকা দেখানো জটিল একটি কাজ। কারণ একই জাতের মধুর ভেতর উপাদানের বিভিন্ন রকম পরিবর্তন হয়। আর মধুর জাতের পার্থক্য তো আছেই। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মধুতে থাকে শর্করা, পানি, খনিজ উপাদান, নাইট্রোজেনভিত্তিক যৌগ, এলকালয়েড, বায়োজেনিক উদ্দীপক, উদ্ভিজ্জ এন্টিবায়োটিক (ফাইটোনসাইড), এনজাইম (ফার্মেন্ট), জৈব এসিড, প্রয়োজনীয় তৈল, সুগন্ধি, ভোলাটাইল, হরমোনাল পদার্থ, এন্টিঅক্সিডেন্ট, এন্টিক্যান্সার, এন্টি টিউমার উপাদান এবং আরো কিছু পদার্থ যা এখনো অজানা অথবা পর্যাপ্ত গবেষণা হয়নি।

শর্করা: মধুর শুষ্ক অংশের বেশিরভাগ এটি দ্বারাই গঠিত (তরল অংশ ১৪%-২০% থাকে)

এক কেজি মধুতে ৩১৫০-৩৩৫০ ক্যালরি থাকে??

গত শতাব্দীর মাঝামাঝি পর্যন্ত মধুকে গ্লুকোজ, ফ্রুকটোজ, সুকরোজ (খাদ্য চিনি) এবং ডেক্সট্রিন নামের একটি অসংজ্ঞায়িত শর্করার একটি সরল মিশ্রণ ভাবা হতো। বিশ্লেষণের নতুন প্রযুক্তি আসার পর বিজ্ঞানীরা আরো কয়েকটি শর্করাকে এই জটিল মিশ্রণ থেকে আলাদা করতে সফল হন।

 

মধুতে বিদ্যমান শর্করা নিম্নলিখিত ভাগে বিভক্ত:

  • মনোস্যাকারাইডস:

মধুর সার্বিক গঠনে এবং শর্করা অংশে সবচেয়ে বেশি থাকে ফ্রুকটোজ এবং গ্লুকোজ। এরা মধুর ইনভার্ট সুগার গঠন করে যার পরিমাণ ৮০%-৯০% পর্যন্ত হতে পারে। মধুর জমে যাওয়া অনেকাংশেই এই দুটি মোনোস্যাকারাইডের অনুপাতের উপর নির্ভরশীল।

মনোস্যাকারাইড হলো সরল চিনি যা জটিল শর্করার (ডাই- ও পলিস্যাকারাইডসের) গাঠনিক উপাদান। মানব দেহে জটিল শর্করা শোষিত হয় না। হজম বা বিপাকের মাধ্যমে শর্করাকে গ্লুকোজ অথবা ফ্রুকটোজে   বিভাজিত হলে তবেই শরীর তাদের গ্রহণ করে।

ফ্রুকটোজ এবং গ্লুকোজ অর্থাৎ ইনভার্ট সুগারের পরিমাণ যত বেশি হয়, মধুর মান তত ভালো হয়। ভেজাল মধুতে ইনভার্ট সুগার সবসময় কম থাকে।

বেশিরভাগ প্রকারের মধুতে ফ্রুকটোজের পরিমাণ (৩৩-৪৪%) গ্লুকোজের চেয়ে (২৫-৪০%) বেশি। তবে কিছু ব্যতিক্রম আছে, যেমন- র‍্যাপসীড, তাই এটি অন্য জাতের মধুর মতো মিষ্টি নয়। ।

সুক্রোসের (বাজার থেকে কেনা চিনি) চেয়ে ফ্রুকটোজ বেশি মিষ্টি। এ কারণেই মধু চিনির চেয়ে মিষ্টি।

ডাইস্যাকারাইডঃ

ল্যাকটোজ, ম্যালটোজ, টুরানোজ, আইসোম্যালটোজ, সুকরোজ, ম্যালটুলোজ, আইসোম্যালটুলোজ, নাইজেরোজ, ট্রাইগ্যালোজ, জেন্টাবায়োজ, ল্যামিনারিবায়োজ

ফুলের রসভেদে মধুতে সুকরোজের পরিমাণ ১%-৬% এবং হানিডিউ মধুতে ১০% পর্যন্ত হয়।

প্রচুর ফুলের উৎস থাকলে অথবা উৎস কাছাকাছি থাকলে মৌমাছির পাকস্থলিতে ফুলের রস অল্প সময় ধরে থাকে, এতে ফুলের রসের প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রভাবিত হয়। ফলে মধুতে সুকরোজের পরিমাণ বেড়ে যেতে পারে।

স্বাভাবিক অবস্থায় সঞ্চিত মধুতে সুকরোজের পরিমাণ ক্রমান্বয়ে কমে যায়। কারণ তখন এনজাইমীয় বিয়োজন লম্বা সময় ধরে চলে। চাক থেকে সংগ্রহ করে জমা করার পরও ইনভার্টেজ এনজাইম সক্রিয় থাকে।

ইনভার্টেজের ধারাবাহিক কার্যক্রমের পরও মধুতে সুক্রোজের পরিমাণ কখনোই শূন্য হয় না। তবে সুক্রোজ পরিমাণে বেশি হওয়ার অর্থ মধু নিম্নমানের এবং ভেজাল।

মধুর জমে যাওয়ার গতিকে প্রভাবিত করে ম্যালটোজ। এর পরিমাণ ৬-৯% (একাসিয়া) হলে মধু ধীরে ধীরে জমে। আর ২-৩% হলে (সূর্যমুখী, সরিষা) স্ফটিকায়ন দ্রুত হয়।

জটিলতর শর্করা (অণুতে দুইয়ের অধিক মোনোস্যাকারাইডবিশিষ্ট):

মধুতে কিছু অলিগোস্যাকারাইড থাকে। পলিস্যাকারাইডের মতো জটিল কোনো কার্বোহাইড্রেট (যেমন-ফাইবার) থাকে না। নিম্নলিখিত উচ্চতর শর্করা মধুতে পাওয়া যায়: এরলোজ, প্যানোজ, ম্যাল্টোট্রায়োজ, কেস্টোজ, আইসোম্যাল্টোট্রায়োজ, মেলিজাইটোজ,আইসোপ্যানোজ, ৬-আলফা-৩-আইসোম্যাল্লটজ গ্লুকোজ, র‍্যাফিনোজ, আইসোম্যাল্ট টেট্রোজেস, আইসোম্যাল্ট পেন্টজেস মধুতে ডেক্সট্রিন থাকে যার পরিমাণ ফুলের রসে ২% এবং হানিডিউ মধুতে ৫% এর বেশি হয় না।

হানিডিউ মধুর কিছু জাতে এর পরিমাণ ১২% পর্যন্ত হতে পারে। কিছু মধুতে মেলিসাইটোজ থাকে যা হাইড্রোলাইসিসের ফলে এটি দুই অণু গ্লুকোজ ও এক অণু ফ্রুক্টোজ ছাড়ে। এটি মূলত হানিডিউ মধুতে থাকে।

One thought on “মধু কী দিয়ে তৈরি?(বিস্তারিত তালিকা)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *